কাজের যত মুক্ত সফটওয়্যার



কম্পিউটারে কাজের কথা বললে প্রথমেই আসে লেখালেখি, টুকটাক হিসাব-নিকাশ আর উপস্থাপনার কথা। একটা সময় ছিল যখন ওয়ার্ডস্টার, ওয়ার্ড পারফেক্ট প্রভৃতি প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডকুমেন্ট প্রসেসিংয়ের কাজ করা হতো। মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহাকারীদের জন্য লেখালেখি, স্প্রেডশিট আর উপস্থাপনার সবচেয়ে কার্যকরী গুচ্ছ সফটওয়্যার হলো ওপেন অফিস। উন্নুক্ত প্রোগ্রামিং সংকেতের এই গুচ্ছ সফটওয়্যারকে অনেক সময় ওপেন অফিস ডট অর্গও বলা হয়, এর ইন্টারনেট ঠিকানার কারণে। এই গুচ্ছ সফটওয়্যারে ওয়ার্ড প্রসেসর হলো রাইটার, স্প্রেডশিট প্রোগ্রামের নাম ক্যাল্ক ও উপস্থাপনার প্রোগ্রামের নাম ইমপ্রেস। প্রত্যেকটি প্রোগ্রামই দৈনন্দিন এবং বিশেষায়িত চাহিদাগুলো পূরণ করে। আমাদের দেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বাড়তি পাওয়া হলো, এই সফটওয়্যার বাংলা ভাষায়ও পাওয়া যায়। তা ছাড়া এগুলো থেকে সরাসরি পিডিএফ ফাইল বানানো যায়। এটি বিনা মূল্যে সংগ্রহ করা যাবে http://www.openoffice.org এই ঠিকানা থেকে।

ব্যবসা ও ব্যক্তিগত হিসাব−নু ক্যাশ

টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে হয় না, এমন মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের অনেকে স্প্রেডশিট প্রোগ্রামে ব্যক্তিগত হিসাব সংরক্ষণ করেন। তবে যাঁরা কম্পিউটারে হিসাব রাখার কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে চান, তাঁদের প্রথম পছন্দের সফটওয়্যার হবে নু ক্যাশ (GNU Cash)। এটি একটি অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার। এর বৈশিষ্ট্য হলো−এটি ডাবল এন্ট্রি অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম রীতি মেনে চলে। সফটওয়্যারে একাধিক মুদ্রা ব্যবহার করা যায়, ফলে টাকায় হিসাব করা যায়। ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সব দেনা-পাওনার হিসাব সংরক্ষণ, সাধারণ লেজার, লাভ-ক্ষতি ও ক্যাশ ফ্লো বিবরণী, ট্রানজেকশন লগ এবং তা খুঁজে বের করা ইত্যাদি কার্যাবলি এতে সম্পন্ন করা যায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি হলো এর মাধ্যমে ইনভয়েস তৈরি করার ব্যবস্থা রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ঋণ ও বন্ধকি হিসাব রয়েছে সেগুলোও আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। রয়েছে, নির্ধারিত তারিখে কোনো আদায়ের ব্যাপার থাকলে তার স্বয়ংক্রিয় ঘোষণার ব্যবস্থা। সঞ্চয়ী ও চলতি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টও এর মাধ্যমে ম্যানেজ করা সম্ভব। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা এর মাধ্যমে তাঁদের শেয়ারবাজারের হিসাব-নিকাশও সংরক্ষণ করতে পারবেন। http://www.gnucash.org থেকে এটি বিনা মূল্যে সংগ্রহ করা যাবে।

সহজে তথ্যভান্ডার ব্যবস্থাপনা

বর্তমানে একটি ওয়েবসাইট থাকা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই অপরিহার্য। একটা সময় ছিল, ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ ও ব্যবস্থাপনা এবং ওয়েবসাইটের কারিগরি ব্যবস্থাপনা সমার্থক ছিল। ফলে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হয় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হতো অথবা নিজস্ব কারিগরি লোকবলের প্রয়োজন হতো। বর্তমানে ওয়েবসাইটের কারিগরি দিক এবং এর মাধ্যমে প্রকাশযোগ্য তথ্যের ব্যবস্থাপনা দুটিকে পৃথক করে ফেলা হয়েছে। জন্ন হয়েছে তথ্যভান্ডার ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (CMS)। এই ব্যবস্থাপনায় একটি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় প্রথমে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়। আর এর তথ্যব্যবস্থাপনায় বিষয়টি থাকে ভিন্ন। সারা বিশ্বে এ রকম যে কয়টি তথ্যব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত, তার প্রায় সবই উন্নুক্ত প্রোগ্রামিং সংকেতের যেমন জুমলা, দ্রুপল ইত্যাদি। এর মধ্যে জুমলা বেশি জনপ্রিয়। জুমলার সাহায্যে একজন ওয়েবসাইট উন্নয়নকর্মী অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে একটি কার্যকরী ডাইনামিক ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। সাধারণভাবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট ও ইন্ট্রানেট দুই-ই এর মাধ্যমে পূরণ করা যায়; রয়েছে অনলাইন বুলেটিন, ম্যাগাজিন প্রকাশের সুবিধা। ওয়েবসাইটটিকে সহজে ম্যানেজ করা যায় এমন কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সেগুলোকে আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রয়েছে শক্তিশালী ব্যবহারকারী ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণনকর্মী আর হিসাব শাখার কর্মীর তথ্য আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেসব তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ওয়েবসাইট উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত, জুমলার দক্ষতা তাঁদের ব্যবসায় প্রসার ঘটাতে পারে সহজে। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট জুমলা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, তাদের জন্য ওয়েবসাইট হালনাগাদ করা খুবই সহজ। কেননা, জুমলাভিত্তিক ওয়েবসাইটে তথ্য যোগ বা হালনাগাদ করা, ছবি যোগ বা মুছে ফেলা খুবই সোজা। যে কেউ কম্পিউটারে টাইপ করতে পারলেই এ কাজগুলো করতে পারবেন। তবে ওয়েবসাইট উন্নয়নের কাজটি কোনো প্রতিষ্ঠান বা দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যক্তির মাধ্যমে করে নেওয়া ভালো। জুমলার ওয়েব ঠিকানা: http://www.joomla.org

ইন্টারনেটে বেচাকেনা

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনলাইন বই বিক্রেতা আমাজন স্টোরের বিক্রি অনেক বেড়েছে। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অনেকেই এখন ইন্টারনেটে বেচাকেনার কাজটি সেরে ফেলতে চান। যেসব প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বা ইন্টারনেটে পণ্য বিক্রি করতে চায়, তাদের অবশ্যই ই-কমার্স সুবিধাযুক্ত ওয়েবসাইটের প্রয়োজন। ই-কমার্স সাইটের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। একটি হলো এতে ক্রেতার কাছ থেকে ‘অনলাইন পেমেন্ট’ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হয়। ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে যে রকম শপিং ট্রলি থাকে, এসব সাইটে সে রকম শপিং কার্টের ব্যবস্থা থাকতে হয়। যেহেতু ক্রেতা সরাসরি ‘তাক’ থেকে মাল নিতে পারে। সে জন্য মজুদের হিসাব থাকতে হবে তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে। এসব বিবেচনা করে গড়ে তুলতে হয় ই-কমার্সভিত্তিক ওয়েবসাইট। নির্মাতা সরাসরি বিক্রি করতে চান, এমন প্রতিষ্ঠানের ই-কমার্স ওয়েবসাইট বানানোর একটি কার্যকর সফটওয়্যার হলো জেনকার্ট। উন্নুক্ত প্রোগ্রামিং সংকেতভিত্তিক জেনকার্টে রয়েছে একাধিক পেমেন্ট-ব্যবস্থা। এক্সএইচটিএমএলভিত্তিক টেমপ্লেট, অসংখ্য ক্যাটাগরি রাখার ব্যবস্থা, একাধিক ডিসপ্লের সুযোগ। এ ছাড়া রয়েছে নিয়মিত গ্রাহকদের ই-মেইলে নতুন পণ্যের খবর জানানো, নিউজ লেটার পাঠানোর ব্যবস্থা। যেসব প্রতিষ্ঠানের ‘গিফট ভাউচার’ ব্যবস্থা রয়েছে, তারা সেগুলোও সহজে করতে পারে। এত সব সুবিধা সংবলিত জেনকার্টের ব্যবস্থাপনা খুবই সহজ। খুবই স্বল্প সময়ে এর সাহায্যে ই-দোকান চালু করা যায়। জেনকার্টভিত্তিক ই-দোকানের কর্মীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে ‘বিশেষজ্ঞ’ হতে হয় না। সাধারণ কর্মীরা সহজেই এটির মাধ্যমে দোকান ব্যবস্থাপনা শিখে ফেলতে পারে। বিনা মূল্যে জেনকার্ট সংগ্রহ করা যাবে http://www.zen-cart.com এই ঠিকানা থেকে।

কাজ যখন সবাই মিলে

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের চাহিদা একদিকে যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের ভৌগোলিক দুরত্বও বাড়ছে। কাজেই ‘কোলাবরেটিভ’ কাজের মাধ্যম হয়ে পড়েছে এখন কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। উন্নত বিশ্ব তো বটেই, এমনকি আমাদের দেশেও এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ই-মেইল, আলাপন হয় তাৎক্ষণিক বার্তায়। যেসব প্রতিষ্ঠান এর থেকে আর একটু এগিয়ে যেতে চায়, তাদের ব্যবহার করতে হয় কোনো না কোনো কোলাবরেটিভ সফটওয়্যার। উন্নুক্ত সোর্সকোড-ভিত্তিক এমন একটি সফটওয়্যার হলো ইগ্রুপওয়্যার। এটি একটি ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার। ইন্টারনেটে বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নেটওয়ার্কে এটি সংস্থাপন করা যায়। এর সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে−ফাইল যা ডকুমেন্ট ম্যানেজার যাতে ডকুমেন্টগুলোর ভার্সনও আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। প্রত্যেক দলিলকে আলাদাভাবে ব্যক্তি বিশেষ, দল বিশেষের জন্য উন্নুক্ত করা যায়। নোটিফিকেশন: যেকোনো বিষয়ে সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত সবাইকে খুব সহজে ই-মেইলের মাধ্যমে কোনো বিষয়ে অবহিত করা যায়। ম্যানেজ করা যায় একাধিক ই-মেইল ঠিকানাও। ক্যালেন্ডার: প্রত্যেক কর্মী আলাদাভাবে বা দলীয়ভাবে নিজেদের কর্মসুচি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন। যেমন কোনো বিপণনকর্মী কোনো গ্রাহকের সঙ্গে মিটিং ঠিক করার আগে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পাওয়া যাবে কি না তা দেখে নিতে পারেন। পুনরাবৃত্তিমূলক অনুষ্ঠান সহজে ম্যানেজ করা যায়। প্রকল্প ও কাজের ব্যবস্থাপনা: রয়েছে প্রজেক্ট ও টাস্ক ম্যানেজার। দলীয় কাজের অগ্রগতি মনিটর করা সহজ।
উপরিউক্ত মডিউল ছাড়াও কোলাবরেটিভ কাজের অন্য সব উপাদানই রয়েছে এই সফটওয়্যারে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে হলে কমপক্ষে একজন দক্ষ কর্মী থাকলে ভালো। ওয়েব ঠিকানা: http://www.egroupware.org.

প্রতিষ্ঠানজুড়ে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

ব্যবসা এখন অনেক জটিল হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানে বিভাগের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। মানবসম্পদ, বিপণন, আদায়, হিসাব, ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিভাগ এবং তার অনুবিভাগে এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভক্ত। সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এখন যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে জরুরি। বর্তমানে এ সফল কাজের জন্য ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ রকম একটি সফটওয়্যার হলো ওপেনইআরপি। এটি উন্নুক্ত প্রোগ্রামিং সংকেতভিত্তিক সফটওয়্যার। একটি করপোরেট অফিস ব্যবস্থাপনায় সফল মডিউল তথা−অ্যাকাউন্টিং, মানবসম্পদ, বিক্রি, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, ইনভেন্টরি, উৎপাদন, সেবা ব্যবস্থাপনা−অর্থাৎ সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এ পর্যন্ত এর ২৪৩টি মডিউল লেখা হয়েছে নানা রকম প্রতিষ্ঠানের জন্য। এই মডিউলগুলো থেকে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মডিউল বাছাই করে নিতে পারে। দুই বা ততধিক মডিউল দিয়ে শুরু করে, ক্রমশ অন্যান্য মডিউল যোগ করা যায়। প্রোপাইটরি ইআরপি সলিউশনের দাম শুনে যাঁরা ইআরপিকে চিন্তা থেকে বাদ রেখেছেন, তাঁরা বিনা মূল্যের ওপেনইআরপি দিয়ে শুরু করতে পারেন তাঁদের প্রচেষ্টা। http://openerp.com

হার্ডডিস্কে সম্পুর্ণ ওয়েবসাইট

আমাদের দেশে ইন্টারনেট এখনো অনেক খরুচে। তদুপরি বিদ্যুতের রয়েছে ব্যাপক আনাগোনা। ফলে ইন্টারনেটে ব্রাউজ করতে গিয়ে সময় ও অর্থ−দুটোর প্রতি মনোযোগ দিতে হয়। এর একটি চমৎকার সমাধান রয়েছে উন্নুক্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এইচটিট্র্যাক নামের একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেকোনো ওয়েবসাইটের একটি সম্পুর্ণ কপি ডাউনলোড করে নেওয়া যায় নিজের কম্পিউটারে। অর্থাৎ যখন আপনার ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে তখন আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত ওয়েবসাইটটি হার্ডডিস্কে কপি করে রাখতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে আপনি আপনার কম্পিউটার থেকেই ওই ওয়েবসাইটটি দেখতে পারবেন। এটি সংগ্রহ করা যাবে http://httrack.com থেকে।

Previous
Next Post »

পোস্ট সম্পর্কিত সমস্যার জন্য মন্তব্য দিন।ডাউনলোড লিঙ্ক এ সমস্যা জন্য ইনবক্স করুন Aimzworld007
ConversionConversion EmoticonEmoticon

Thanks for your comment